
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নজিরবিহীন খেলাপি ঋণের চাপ কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঋণগ্রহীতারা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা পাচ্ছেন।
পুনঃতফসিল করা ঋণের সুদের হার সংশ্লিষ্ট খাতের সর্বনিম্ন সুদের তুলনায় ১ শতাংশ কম নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, জালিয়াতি, প্রতারণা বা ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা এসব সুবিধার আওতার বাইরে থাকবেন। কেবল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা, ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নীতিমালায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা অনাপত্তির প্রয়োজন হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিধি-বিধান অনুসরণ করে গ্রাহকের আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারবে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহকরাও সর্বোচ্চ চারবার ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুযোগ পাবেন, যেখানে সর্বোচ্চ ২১ বছর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে বড় করপোরেট ঋণখেলাপিসহ প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১৫ বছর সময়, ন্যূনতম ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং সর্বোচ্চ তিন বছর গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এটি দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকার পরিবর্তনের আগে গত জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা এবং গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে গত ৭ ডিসেম্বর ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ঋণ পুনর্গঠন ও আংশিক অবলোপনের সুবিধা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার তাগিদ দেন। এর আগে ৪ ডিসেম্বর মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির এবং আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ ঋণ আংশিক অবলোপনের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনে জারি করা নীতিসহায়তা সার্কুলারগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর।
এদিকে কৃষি ও এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গভর্নর জানান, জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ হলেও মোট ঋণের মাত্র ২ শতাংশ এই খাতে যায়। কৃষি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি করা এবং সিএমএসএমই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিএমএসএমই খাতে প্রভিশনিং ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর আশ্বাস দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিসহায়তা ও পুনর্গঠন উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়ক হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাতকে আরও স্বচ্ছ ও টেকসই পথে এগিয়ে নেবে।
মন্তব্য করুন