
বাংলাদেশের কৃষিখাতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন রংপুরের তরুণ উদ্যোক্তা গাউসুল আজম। মাত্র ২১ বছর বয়সে শূন্য বিনিয়োগে শুরু করা উদ্যোগ আজ বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অনলাইনভিত্তিক কৃষিযন্ত্র বিক্রি, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং কৃষি বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন—বহুমুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এখন দেশজুড়ে পরিচিত।
২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে কৃষিযন্ত্র বিক্রি শুরু করেন গাউসুল আজম। প্রথমদিকে ধান কাটার যন্ত্র হ্যান্ড রিপার বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু হলেও ধীরে ধীরে কৃষিযন্ত্রের পরিসর বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত “কৃষি বাজার লিমিটেড” দেশের সব জেলার ৪০ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে ৩৫০টির বেশি ধরনের কৃষিযন্ত্র ও কৃষিপণ্য সরবরাহ করেছে।
ছোট ও মাঝারি কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য চীন থেকে আমদানি করা মিনি টিলারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষিযন্ত্র এখন কৃষি বাজারের মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কৃষকদের শ্রম ও সময়—দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।
গাউসুল আজম ২০১৪ সালে রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে তড়িৎ ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। তবে আর্থিক সংকটের কারণে ২০১৭ সালে তাঁর ডিপ্লোমা শেষ করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ময়মনসিংহের এক আমদানিকারকের কাছ থেকে কৃষিযন্ত্র সম্পর্কে ধারণা পান। সেখান থেকেই কৃষিযন্ত্র বিক্রির ধারণা জন্ম নেয়।
ফেসবুকে ভিডিও প্রচারের মাধ্যমে প্রথমে একটি যন্ত্র বিক্রি করে ১,৫০০ টাকা লাভ করেন তিনি। পরে কয়েক মাসে প্রায় ৮০টি ধান কাটার যন্ত্র বিক্রি করেন। সেই সময় তাঁর ফেসবুক পেজের নাম ছিল Digital Marketing for Rural Enterprise। পরে কৃষকদের জন্য সহজ নাম হিসেবে সেটি পরিবর্তন করে রাখা হয় “কৃষি বাজার”।
২০১৮ সালে স্ত্রী রাজিয়া সুলতানাকে ব্যবসায় যুক্ত করেন গাউসুল আজম। রংপুর শহরের রাধাবল্লভ এলাকায় এক রুমের ভাড়া অফিসে মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে শুরু হয় কৃষি বাজারের কার্যক্রম।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৫৫ জন কর্মী কাজ করছেন। একই এলাকায় ১০ শতাংশ জমিতে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়্যারহাউস ও বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।
গ্রাহকদের সুবিধার জন্য ২০২২ সালে কৃষিযন্ত্রের সরাসরি সার্ভিসিং সেবা চালু করা হয়। প্রয়োজনে গ্রাহকদের ভিডিও কলের মাধ্যমেও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার কৃষিযন্ত্র বিক্রি হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান থেকে।
কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য গাউসুল আজম চালু করেছেন “কৃষকের স্কুল” নামে একটি উদ্যোগ।
২০২৪ সাল থেকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজারের বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
রংপুরের কদমতলা বাজার এলাকায় প্রায় চার একর জমিতে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কৃষকদের গুড অ্যাগ্রিকালচার প্র্যাকটিস (GAP) সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে ৮৫টি কৃষিপণ্য চাষের ওপর অনলাইন ভিডিও তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে কৃষি বাজার চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ শুরু করে।
নীলফামারীর জলঢাকা এলাকায় ৩৪০ জন কৃষককে নিয়ে প্রায় ৭৫০ একর জমিতে আলু চাষ করা হয়। একই সঙ্গে রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার ৭৭৫ জন কৃষককে নিয়ে ১,০৪৮ একর জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়।
চুক্তিভিত্তিক চাষে কৃষকদের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহের পাশাপাশি ঋণ সুবিধা পেতেও সহায়তা করে কৃষি বাজার। ঢাকা ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে কৃষকদের ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মৌসুমে প্রায় ৭ কোটি টাকার ভুট্টা বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি বছর থেকে কৃষি বাজার নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি বর্জ্য—যেমন কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ ও ভুট্টার গাছ—ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি “কৃষি খড়ি”।
এই জ্বালানি ব্যবহার করলে রান্নার খরচ প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম হতে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা গাউসুল আজম।
এ ছাড়া গোবর থেকে জৈবসার তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠানটি ডি-ওয়াটারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
গাউসুল আজম মনে করেন, প্রযুক্তি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিকে আরও লাভজনক করা সম্ভব। তাঁর ভাষায়—
“প্রায়ই শোনা যায় কৃষক উৎপাদন করে লাভ পান না। তাই আমরা চুক্তিভিত্তিক চাষ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের লাভবান করার চেষ্টা করছি।”
তরুণ বয়সে শুরু করা ছোট উদ্যোগ আজ হাজারো কৃষকের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের পথে গাউসুল আজমের এই উদ্যোগ অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন