
২০১৯ সালে একা শুরু করা এই উদ্যোগে এখন প্রায় ৭০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।
ফারজানা আকতারের শৈশব কেটেছে কুমিল্লায়। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। সংসারের খরচ চালাতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাত্র ৩০০ টাকা বেতনে টিউশনি শুরু করেন তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি কখনো এনজিওতে কাজ করেছেন, কখনো স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে তিনি Comilla Victoria Government College থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৪ সালে ঢাকায় এসে শুরু করেন টেলিভিশন সাংবাদিকতা।
ঢাকার ব্যয়বহুল জীবনে টিকে থাকার জন্য ফারজানা বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে থাকেন। ২০১৮ সালে অনলাইনভিত্তিক খাবারের ব্যবসা শুরু করেন এবং পরে জামদানি শাড়ি ও লুঙ্গি বিক্রির একটি উদ্যোগ নেন।
কিন্তু সেই ব্যবসায় সফল হতে না পেরে তিনি বুঝতে পারেন—যে পণ্যের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও আগ্রহ নেই, সেই ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন। তাই তিনি সেই উদ্যোগ বন্ধ করে নতুনভাবে চিন্তা শুরু করেন।
সাংবাদিকতা করার সময় নদী দখল ও দূষণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে ফারজানা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেন—রাজধানীর বাজারে ফরমালিনমুক্ত ও টাটকা নদীর মাছ পাওয়া খুবই কঠিন।
এই সমস্যাকেই সম্ভাবনায় রূপ দেন তিনি। ২০১৯ সালের মার্চে শুরু করেন মাছের ব্যবসা—River Fish। লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন নদী, হাওর ও বিল থেকে সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক মাছ সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এই উদ্যোগে শুরু থেকেই পাশে ছিলেন ফারজানার স্বামী সফটওয়্যার প্রকৌশলী Tanvir Azad।
তিনি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েবসাইট এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছেন। ফারজানা দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মাছ সংগ্রহের নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, আর তানভীর প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করেন।
ব্যবসা শুরু করার আগে ফারজানা তিন মাস ধরে গভীর রাতে রাজধানীর বিভিন্ন মাছের আড়তে ঘুরে ঘুরে মাছ চিনতে শিখেছেন।
রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে তিনি কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তে গিয়ে মহাজন ও শ্রমিকদের কাছ থেকে মাছের ধরন, উৎস ও সংরক্ষণের কৌশল শিখেছেন।
তাঁর ভাষায়, “সেখানে সবাই আমাকে খুব সহযোগিতা করেছে। অনেকেই উৎসাহ দিয়ে মাছ চিনতে সাহায্য করেছেন।”
২০১৯ সালের আগস্টে মাত্র দুইজন কর্মী নিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৭০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
করোনা মহামারির সময় যখন অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, তখন ফারজানা সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরো সময়ের জন্য তাঁর ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।
প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু মাছ বিক্রিই করছে না। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য চালু করা হয়েছে ‘River Fish Kitchen’, যেখানে মাছ রান্না করে বিশেষভাবে প্যাকিং করে দেওয়া হয়, যাতে প্রবাসীরা সহজে বিদেশে নিয়ে যেতে পারেন।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে পাওয়া যায় দেশি মুরগি, হাঁস, খাসির মাংস এবং বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি।
ফারজানা আকতার মনে করেন, আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
তাঁর কথায়, “নিজেকে শুধু নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে। তাহলে জীবনের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হয়।”
বর্তমানে তিনি নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সহায়তা দিচ্ছেন, যাতে আরও অনেক নারী স্বাবলম্বী হতে পারেন।
মন্তব্য করুন